সংক্ষেপে উত্তরটা সোজা। একটি ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সাধারণ ডেটা সেন্টার দিনে প্রায় ২০ লাখ লিটার জল খায়। এটা প্রায় ৭৫ হাজার বাড়ির বিদ্যুৎ খরচের সমান ক্ষমতার সেন্টার।
কিন্তু এই একটিমাত্র সংখ্যা দিয়ে বিষয়টা বোঝার উপায় নেই, কারণ প্রশ্নটা যত সরল দেখায়, উত্তরটা ঠিক ততটাই জটিল। একই ডেটা সেন্টারের জল খরচ দুই ভাগে ভাগ করা যায় — সরাসরি সাইটে বাষ্প হওয়া জল, আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরোক্ষভাবে খরচ হওয়া জল। বেশিরভাগ খবরে এই দুটো মিশিয়ে দেওয়া হয়, ফলে সংখ্যাগুলো এত আলাদা দেখায়।
এই লেখার প্রতিটি সংখ্যায় আমি সূত্র দিয়েছি, কারণ বিষয়টায় ভুল তথ্য প্রচুর। আমি যখন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজের রিপোর্ট খুঁজতে গেলাম, তখন একটা বড় ফাঁক পেলাম — কোনও কোম্পানিই AI-ভিত্তিক কাজে ঠিক কতটা জল খরচ হচ্ছে তা আলাদা করে জানায় না।
আগে বুঝে নিন WUE কী
ডেটা সেন্টারের জল খরচ মাপা হয় WUE বা ওয়াটার ইউজেজ ইফেক্টিভনেস দিয়ে। বছরে শীতলীকরণ ও আর্দ্রতায় যে লিটার জল খরচ হলো, তাকে IT যন্ত্রপাতির মোট কিলোওয়াট-ঘণ্টা দিয়ে ভাগ করুন। ব্যাস।
মাইক্রোসফটের নিজের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের FY২৫ সালে বিশ্বব্যাপী গড় WUE ছিল ০.২৭ লিটার প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা। আগের বছর FY২৪-এ ছিল ০.৩০। কোম্পানিটির দাবি, দুই দশকে তারা এই হার ৯০ শতাংশ কমিয়েছে।
এখানেই সমস্যা। মার্কিন অলাভজনক সংস্থা EESI জানাচ্ছে, ডেটা সেন্টারগুলোর গড় WUE প্রায় ১.৯ লিটার প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা। এই দুটো সংখ্যার মধ্যে সাত গুণের ফারাক।
মাইক্রোসফট মিথ্যা বলছে না। EESI-ও নয়। পার্থক্যটা হল মাপার পদ্ধতিতে। মাইক্রোসফট শুধু সাইটে বাষ্প হওয়া জল গোনে। EESI বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার খনি থেকে পাওয়ার প্ল্যান্ট পর্যন্ত জল খরচ যোগ করে। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় গড়ে ১.২ গ্যালন জল খায়। সেটা যোগ করলেই সংখ্যাটা লাফিয়ে বাড়ে।

ঐ ২০ লাখ লিটার কোথা থেকে এল
সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত সংখ্যাটা দিয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা IEA। তাদের হিসাবে, আমেরিকার একটি ১০০ মেগাওয়াট ডেটা সেন্টার দিনে প্রায় ২০ লাখ লিটার জল খায়। বিদ্যুতে ৭৫ হাজার বাড়ির সমান।
IEA-র তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে সারা বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলো মিলিয়ে প্রায় ৫৬০ বিলিয়ন লিটার জল খরচ করেছে। এক বছরে।
আমেরিকার হিসাবটা শুনুন EESI থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারগুলো দিনে ৪৪.৯ কোটি গ্যালন জল খায় এবং বছরে ১৬ হাজার ৩৭০ কোটি গ্যালন। ২০২১ সালের তথ্য এটি।
আমেরিকার ওই সেন্টারগুলোর মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি সেন্টার আছে। ছোট ব্যাপার নয়।

AI-র ভাগটা আলাদা করে কেউ বলে না
এই লেখার সবচেয়ে জরুরি অংশ এই। ২০২৫ সালের একটি পিয়ার-রিভিউড গবেষণা আমি পড়েছি, যেখানে বিশাল একটি ফাঁক ধরা পড়েছে।
গবেষণায় ১১টি বড় প্রযুক্তি কোম্পানির পরিবেশগত রিপোর্ট পরীক্ষা করা হয়েছিল — অ্যামাজন, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা, অ্যাপল, বাইডু, টেনসেন্ট, ওরাকল সহ আরও কয়েকটি। ফলাফল স্পষ্ট। একটিও না।
আরও আশ্চর্যের ব্যাপার? বড়রা পরোক্ষ জল খরচ প্রায় কেউই জানায় না। গুগল সোজা কথা বলেছে — বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে জল খরচ হয়, সেটা তারা নিয়ন্ত্রণ করে না, তাই জানাবে না। গবেষকরা এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কারণ এই জল খরচটা গুগল নিজের বিদ্যুতের চাহিদারই সরাসরি ফল।
মোট ক্ষতির হিসাবটা তাই অনুমাননির্ভর। গবেষণাপত্রের হিসাবে, ২০২৫ সালে AI সিস্টেমগুলোর জল খরচ হতে পারে ৩১২.৫ বিলিয়ন থেকে ৭৬৪.৬ বিলিয়ন লিটারের মধ্যে। এই রকম বিস্তৃত অনিশ্চয়তার কারণটাই হল স্বচ্ছতার অভাব।
তুলনা করুন। পুরো বিশ্বে বছরে যত বোতলজাত জল খরচ হয়, তার পরিমাণ প্রায় ৪৪৬ বিলিয়ন লিটার। অর্থাৎ AI-র ঝুঁকির পুরো সীমাটাই বোতলজাত জলের বাজারের কাছাকাছি।
ভারতের প্রসঙ্গটা কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভারত দ্রুত ডেটা সেন্টার হাব হয়ে উঠছে। আর এই সম্প্রসারণের বেশিরভাগই হচ্ছে সেই শহরগুলোতে, যেখানে ভূগর্ভস্থ জল আগেই চাপে — মুম্বই, চেন্নাই, হায়দরাবাদ এবং পুণে।
মাইক্রোসফটের নিজের আঞ্চলিক তথ্যটা এখানে লক্ষ্য করার মতো। FY২৫ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের WUE ছিল ০.২৫ — যা আগের বছর ছিল মাত্র ০.০৩। মানে আট গুণের বেশি বৃদ্ধি।
অথচ ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় সেই WUE অপরিবর্তিত। ০.০৩-ই আছে। অর্থাৎ জল খরচ নির্ভর করে সাইটটা কোথায় বসছে এবং কোন শীতলীকরণ পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে তার উপর। আবহাওয়া শুষ্ক হলে বাষ্পীয় শীতলীকরণে অনেক বেশি জল লাগে।
আমেরিকায় এশিয়ার চেয়েও বেশি। WUE ০.৩৪। কারণ একাধিক শুষ্ক অঞ্চলের সাইট।
আর কতটা বাড়বে
এই মুহূর্তের সংখ্যাটাই আসল কথা নয়। কারণ সম্প্রসারণ এখনও শেষ হয়নি।
EESI-র তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালে ডেটা সেন্টারগুলো বছরে ১,০৫০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ করতে পারে। ২০২৩ সালে সেটা ছিল ১৭৬। বিদ্যুৎ ছয় গুণ বাড়লে জলও বাড়বে।
আর একটি গবেষণার হিসাবে টেক্সাসে ২০২৫ সালে ডেটা সেন্টারে জল খরচ হবে ৪৯ বিলিয়ন গ্যালন, আর ২০৩০-এ সেটা ৩৯৯ বিলিয়ন গ্যালনে পৌঁছতে পারে। আট বছরে আট গুণ বৃদ্ধি।
কোম্পানিগুলো কী করছে সমাধানে
ছবিটা একেবারে অন্ধকার নয়। মাইক্রোসফট ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে নতুন ডিজাইনের ডেটা সেন্টার চালু করেছে। বদ্ধ লুপে জল ঘুরতে থাকে। নতুন জল লাগে না।
কোম্পানির হিসাব মতে, প্রতি সেন্টারে বছরে ১২ কোটি ৫০ লক্ষ লিটারের বেশি জল বাঁচে। ফিনিক্সের সাইটগুলোতে এক বছরে WUE ২৩ শতাংশ কমেছে।
সীমাবদ্ধতাটাও জানা দরকার। এই ডিজাইন পুরো বহরে লাগু হয়নি। ফিনিক্স এবং উইসকনসিনের নতুন প্রকল্পে ২০২৬ সালে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হবে, আর সাইটগুলো চালু হবে ২০২৭-এর শেষে।
বোতল প্রতি প্রম্পট অঙ্কটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য
সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরতে থাকা একটি সংখ্যা খুব জনপ্রিয় — একটি AI প্রম্পটে নাকি এক বোতল জল খরচ হয়। EESI অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের হিসাবে ১০০ শব্দের একটি প্রম্পটে প্রায় ৫১৯ মিলিলিটার জল খরচ হয়।
কিন্তু বিশ্বাস করার আগে একটা কথা মনে রাখুন। এটা সরাসরি মাপা তথ্য নয়। মডেল-ভিত্তিক অনুমান। আর এতে সাইটের জল ও পরোক্ষ জল মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সহজ কথায় — প্রম্পট প্রতি অঙ্কটা আলোচনার জন্য ভাল। নীতির জন্য নয়। বড় ছবিটা বোঝার জন্য WUE আর মোট খরচের দিকে তাকানো বেশি কাজের।
শেষে যা মনে রাখা দরকার
তিনটি বিষয় এই লেখা থেকে পরিষ্কার। এতটুকু।
প্রথম কথা। একটাই সংখ্যা দিয়ে উত্তর হয় না। ১০০ মেগাওয়াট সেন্টারের দিনে ২০ লাখ লিটার কথাটা সত্য, কিন্তু সেটা শুধু সরাসরি জল। পরোক্ষ জল যোগ করলে হিসাব অনেক বড়।
দ্বিতীয় কথা। স্বচ্ছতার বড় অভাব আছে। কোনও কোম্পানি AI-র আলাদা জল খরচ জানায় না। তাই এই ক্ষেত্রের যত সংখ্যা প্রকাশিত হয়, তার একটি বড় অংশ অনুমান।
তৃতীয় কথা। দিকটা ভালো হতে পারে। যদি নতুন ডিজাইন সত্যিই পুরো বহরে লাগু হয়। মাইক্রোসফটের তথ্য দেখাচ্ছে প্রযুক্তি আছে। প্রশ্ন একটাই। গতি কতটা দ্রুত?




