ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, তখন বাইশ গজে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখল ভারতীয় ক্রিকেট দল। এশিয়া কাপ ২০২৫ (Asia Cup 2025)-এর বহুল প্রতীক্ষিত গ্রুপ পর্বের ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে ৭ উইকেটে উড়িয়ে দিল সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন ভারত। কুলদীপ যাদবের স্পিনের জালে আটকা পড়ে পাকিস্তানি ব্যাটিং লাইনআপ মাত্র ১২৭ রানে গুটিয়ে যায়, যা ভারত ২৫ বল বাকি থাকতেই টপকে যায়। এই জয়ের ফলে এশিয়া কাপে ভারত নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচেও অপরাজিত রইল।
দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তানি অধিনায়ক সালমান আলী আগা। তবে শুরু থেকেই ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে ধুঁকতে থাকে পাকিস্তান। বিশেষ করে ভারতীয় স্পিনাররা, কুলদীপ যাদব এবং অক্ষর প্যাটেল, পাক ব্যাটসম্যানদের রানের গতিতে লাগাম পরিয়ে দেন এবং নিয়মিত উইকেট তুলে নিতে থাকেন। শেষদিকে শাহীন আফ্রিদির বিস্ফোরক ক্যামিও না থাকলে পাকিস্তানের স্কোর আরও লজ্জাজনক হতে পারত। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ভারতও শুরুতে দুটি উইকেট হারালেও, তিলক ভার্মা এবং অধিনায়ক সূর্যকুমারের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে সহজ জয় তুলে নেয়।
এক নজরে ম্যাচ
- ফলাফল: ভারত ৭ উইকেটে জয়ী।
- পাকিস্তানের স্কোর: ১২৭/৯ (২০ ওভার)। শাহীন আফ্রিদি ৩৩*, সাহিবজাদা ফারহান ৪০; কুলদীপ যাদব ৩/১৮, অক্ষর প্যাটেল ২/১৮।
- ভারতের স্কোর: ১৩১/৩ (১৫.৫ ওভার)। সূর্যকুমার যাদব ৪৭*, তিলক ভার্মা ৩১, অভিষেক শর্মা ৩১; সাঈম আইয়ুব ৩/৩৫।
- প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ: কুলদীপ যাদব (ভারত)।
- প্রভাব: এই জয়ের ফলে গ্রুপ ‘এ’-তে ভারত নিজেদের শীর্ষস্থান আরও মজবুত করল এবং সুপার ফোর পর্বের দিকে এক পা বাড়িয়ে রাখল।
বিশ্লেষণ: স্পিনের জালে আটকা পড়ল পাকিস্তান
পাকিস্তানের ব্যাটিং বিপর্যয়
টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তানের শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। ম্যাচের দ্বিতীয় বলেই হার্দিক পান্ডিয়ার বলে শূন্য রানে ফেরেন সাঈম আইয়ুব। পরের ওভারে জসপ্রীত বুমরাহর শিকার হন মোহাম্মদ হারিস (৩)। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে সাহিবজাদা ফারহান (৪৪ বলে ৪০) এবং ফখর জামান (১৫ বলে ১৭) জুটি গড়ার চেষ্টা করলেও, পাওয়ারপ্লের পরেই ভারতীয় স্পিনাররা আক্রমণে আসেন।
অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবের স্পিন-নির্ভর রণনীতি দুর্দান্তভাবে কাজ করে। কুলদীপ যাদব (৪ ওভারে ১৮ রানে ৩ উইকেট) এবং অক্ষর প্যাটেল (৪ ওভারে ১৮ রানে ২ উইকেট) মাঝের ওভারগুলিতে পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। বরুণ চক্রবর্তীও একটি উইকেট নেন। একটা সময় ৯৭ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল পাকিস্তান। সেখান থেকে, দশম উইকেটে শাহীন আফ্রিদির ঝোড়ো ব্যাটিং (১৬ বলে ৩৩*,
পরিসংখ্যান ১: ভারতীয় স্পিনারদের দাপট
| বোলার | ওভার | রান | উইকেট | ইকোনমি রেট |
| কুলদীপ যাদব | ৪ | ১৮ | ৩ | ৪.৫০ |
| অক্ষর প্যাটেল | ৪ | ১৮ | ২ | ৪.৫০ |
| বরুণ চক্রবর্তী | ৪ | ২৪ | ১ | ৬.০০ |
| মোট | ১২ | ৬০ | ৬ | ৫.০০ |
| (উৎস: ESPNcricinfo, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫) |
এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে দুবাইয়ের মন্থর উইকেটে ভারতীয় স্পিন ত্রয়ী কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল।
ভারতের নিয়ন্ত্রিত রান তাড়া
১২৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারতের শুরুটা আগ্রাসী মেজাজে করেন অভিষেক শর্মা (১৩ বলে ৩১)। শাহীন আফ্রিদির প্রথম ওভারেই একটি চার ও একটি ছক্কা হাঁকান তিনি। তবে দ্রুত উইকেট হারাতে থাকে ভারত। সাঈম আইয়ুবের ক্যারম বলে স্টাম্পড হন শুভমান গিল (৭)। এরপর অভিষেক শর্মা এবং তিলক ভার্মাও সাঈম আইয়ুবের শিকার হন। ৪১ রানে ২ উইকেট এবং পরে ৯৭ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ভারত কিছুটা চাপে পড়লেও, অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব (৩৭ বলে ৪৭*) এবং শিবম দুবে (৭ বলে ১০*) অবিচল থেকে দলকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দেন। সূর্যকুমার তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মাঠের চারপাশে শট খেলে রান তাড়ার চাপকে কখনোই বাড়তে দেননি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মাঠের বাইরের ঘটনা
এবারের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি শুধুমাত্র ক্রিকেটীয় লড়াই ছিল না, এর পেছনে ছিল তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা। চলতি বছরের শুরুতে পাহালগাম সন্ত্রাসী হামলার পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। যার জেরে ম্যাচটি বয়কটেরও ডাক ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। এমনকি, টসের সময় দুই অধিনায়ক, সূর্যকুমার যাদব এবং সালমান আলী আগা, প্রথাগত করমর্দন এড়িয়ে যান, যা ম্যাচের উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয় ।
বিসিসিআই সচিব দেভাজিৎ সাইকিয়া অবশ্য জানিয়েছিলেন যে, সরকারি নীতি মেনেই বহুজাতিক টুর্নামেন্টে খেলতে বাধ্য তারা, তবে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলার কোনো সম্ভাবনা নেই (সূত্র: The Economic Times)। এই উত্তপ্ত আবহের মধ্যেই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটীয় দক্ষতাই জয়লাভ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ম্যাচের আগে থেকেই ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা ভারতকে এগিয়ে রেখেছিলেন। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন স্পিনার মন্টি পানেসার বলেন, “ভারতের দল অনেক বেশি শক্তিশালী এবং পাকিস্তানকে জিততে হলে ১০-২০ শতাংশ অতিরিক্ত esfuerzo দিতে হবে”। ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার নিখিল চোপড়া পাকিস্তানের বর্তমান দলটিকে অনভিজ্ঞ বলে অভিহিত করে বলেন, এই দলের তারকা ক্রিকেটারের অভাব রয়েছে, যা ভারতের জন্য কাজটা সহজ করে দেবে (সূত্র: NDTV)। ম্যাচের ফল বিশেষজ্ঞদের মতামতকেই সঠিক প্রমাণ করল।
অধিনায়কদের প্রতিক্রিয়া
টসের সময় পাকিস্তানি অধিনায়ক সালমান আলী আগা বলেন, “আমরা প্রথমে ব্যাট করতে চেয়েছিলাম। উইকেট কিছুটা মন্থর মনে হচ্ছে। বোর্ডে একটা ভালো রান তুলে বোলারদের কাজটা সহজ করে দিতে চাই।” ।
অন্যদিকে, ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব বলেন, “আমরা প্রথমে বোলিং করতেই চেয়েছিলাম, তাই খুশি। এখানকার আর্দ্র আবহাওয়ায় রাতে শিশিরের একটা প্রভাব থাকতে পারে, যা রান তাড়া করতে সাহায্য করবে। আমরা একই দল নিয়ে খেলছি।”
সামনের পথ
এই জয়ের পর ভারত গ্রুপ পর্বে তাদের শেষ ম্যাচে ওমানের মুখোমুখি হবে। অন্যদিকে, টিকে থাকতে হলে পাকিস্তানকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর বিরুদ্ধে জয়ের পাশাপাশি অন্যান্য ম্যাচের ফলাফলের দিকেও তাকিয়ে থাকতে হবে। দুই দল যদি সুপার ফোর পর্বে ওঠে, তাহলে আরও একবার তাদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে, যা নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে উত্তেজনা এখন থেকেই তুঙ্গে।




