আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের অধিনায়ক মুহাম্মদ ওয়াসিম। এতদিন ধরে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হিসেবে সর্বাধিক ছক্কা মারার যে রেকর্ড রোহিত শর্মার দখলে ছিল, তা এবার নিজের করে নিলেন এই বিস্ফোরক ওপেনার। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ত্রিদেশীয় সিরিজের একটি ম্যাচে দুর্দান্ত অর্ধশতরান করার পথেই এই ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।

ক্রিকেটের ক্ষুদ্রতম সংস্করণে পাওয়ার-হিটিং এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। যেখানে প্রায়শই ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের দাপট লক্ষ্য করা যায়, সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো একটি সহযোগী দেশের অধিনায়কের এই কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। ওয়াসিমের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ডের খাতাই ভারি করল না, বরং বিশ্ব ক্রিকেটের মঞ্চে সহযোগী দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান শক্তিকেও প্রতিষ্ঠিত করল।

যেভাবে ভাঙল রোহিতের রেকর্ড

শারজায় আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত ম্যাচে সংযুক্ত আরব আমিরাত হারলেও, অধিনায়ক ওয়াসিমের ব্যাট থেকে আসে ৩৭ বলে ৬৭ রানের এক অনবদ্য ইনিংস। তার এই ইনিংসে ছিল ৬টি বিশাল ছক্কা ও ৪টি চার। এই ছয়টি ছক্কার মাধ্যমেই তিনি টপকে যান রোহিত শর্মার রেকর্ড।

ম্যাচের পূর্বে, টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অধিনায়ক হিসেবে রোহিত শর্মার ছক্কার সংখ্যা ছিল ১০৫টি, যা তিনি ৬২টি ইনিংসে মেরেছিলেন। অন্যদিকে, মুহাম্মদ ওয়াসিম এই ম্যাচ শুরু করার আগে অধিনায়ক হিসেবে ৫৩ ইনিংসে ১০৪টি ছক্কা মেরেছিলেন। আফগান স্পিনার মুজিব-উর-রহমানের এক ওভারে পরপর দুটি ছক্কা হাঁকিয়ে তিনি রোহিতকে টপকে যান এবং বিশ্বের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে ১১০টি ছক্কার মাইলফলক স্পর্শ করেন। বর্তমানে তার মোট ছক্কার সংখ্যা ১১০।

অধিনায়ক হিসেবে সর্বাধিক ছক্কার তালিকা (T20I):

ক্রিকেটার দেশ ছক্কা
মুহাম্মদ ওয়াসিম সংযুক্ত আরব আমিরাত ১১০*
রোহিত শর্মা ভারত ১০৫
ইয়ন মর্গ্যান ইংল্যান্ড ৮৬
অ্যারন ফিঞ্চ অস্ট্রেলিয়া ৮২
কেন উইলিয়ামসন নিউজিল্যান্ড ৭৬

শুধু নেতৃত্বেই নয়, সার্বিকভাবেও সেরাদের তালিকায় ওয়াসিম

মুহাম্মদ ওয়াসিমের এই কৃতিত্ব শুধুমাত্র অধিনায়কত্বের পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সর্বাধিক ছক্কা মারার সার্বিক তালিকাতেও তিনি দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন। এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন রোহিত শর্মা, যার ছক্কার সংখ্যা ২০৫। ওয়াসিম (১৭৬* ছক্কা) এই ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের মার্টিন গাপটিলকে (১৭৩ ছক্কা) পিছনে ফেলে দিয়েছেন।

এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কতটা ধারাবাহিকতার সাথে বড় শট খেলতে পারদর্শী ওয়াসিম। তার স্ট্রাইক রেট (১৫৬.৩১) এবং গড় (৩৮.১২) ঈর্ষণীয়। ৮০টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তিনি ২,৮৫৯ রান করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ৩টি শতরান এবং ২৩টি অর্ধশতরান। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আর কোনো ব্যাটসম্যানের ১,৩০০ রানও নেই, যা ওয়াসিমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে।

কে এই মুহাম্মদ ওয়াসিম?

পাকিস্তানের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণকারী ওয়াসিম ২০১৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার আগ্রাসী ব্যাটিং শৈলী এবং বড় শট খেলার ক্ষমতা তাকে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের একজন खतरनाक খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। তার নেতৃত্বেই সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল।

ভিত্তিহীন শিরোনাম এবং আসল তথ্য

কিছু সংবাদমাধ্যমে “ছয় ছক্কায় বাজিমাত” বা “অখ্যাত ব্যাটারের হাতে রোহিতের রেকর্ড ভাঙল” – এই ধরনের শিরোনাম করা হলেও, তা বিভ্রান্তিকর। ওয়াসিম এই ম্যাচে ৬টি ছক্কা মেরেছেন, কিন্তু এক ওভারে ৬টি ছক্কা মারেননি। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের অধিনায়ক এবং বিশ্ব ক্রিকেটে একজন পরিচিত মুখ, কোনো “অখ্যাত” ব্যাটার নন। আসল রেকর্ডটি হলো, অধিনায়ক হিসেবে সর্বাধিক ছক্কা মারার, কোনো এক ইনিংসে সর্বাধিক ছক্কা মারার রেকর্ড নয়।

মুহাম্মদ ওয়াসিমের এই সাফল্য বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম এবং সুযোগ পেলে যেকোনো দেশের ক্রিকেটারই বিশ্বমঞ্চে নিজের ছাপ রাখতে পারে। রোহিত শর্মার মতো একজন কিংবদন্তি ক্রিকেটারকে টপকে যাওয়া নিঃসন্দেহে ওয়াসিমের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। আগামী দিনে তার ব্যাট থেকে এমন আরও অনেক বিস্ফোরক ইনিংস দেখার অপেক্ষায় থাকবে ক্রিকেট বিশ্ব। তার এই উত্থান সহযোগী দেশগুলোর ক্রিকেটারদের জন্য এক নতুন অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।